স্মৃতিকথা

লিখে না রাখলে গল্পরা হারিয়ে যায়।
অখণ্ডিত বাংলার কুমিল্লা জেলায় মায়ের দিদাদের বাড়ি ছিল। দিদা খুব সচ্ছল পরিবারের মেয়ে ছিলেন, আর ছিলেন অসম্ভব রূপসী। তাদের প্রতিবেশী ছিলেন শচিন দেব বর্মণ, তখন তার অত নামডাক হয়নি; তিনি নাকি বহুবার দিদাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন।দিদার রাশভারী বাবা যারপরনাই তাচ্ছিল্যের সাথে সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেন কারণ রাজপূত-ক্ষত্রিয় ছাড়া অন্য কোনো জাতে বিয়ে দিয়ে অসম্মান কোড়ানোর ভয় ছিল তার। যাই হোক, মায়ের দিদার বিয়ে হয় কূমিল্লার আরেক নামকরা ক্ষত্রিয় পরিবারে। দিদার বয়েস তখন পনেরো, পাত্রের বয়েস বড়োজোর কুড়ি। প্রভাবশালী হওয়ার সুবাদে এই পরিবারটির শত্রুদের সংখ্যা কিছু কম ছিলোনা।
ঘটনাটি ঘটে এক শীতের রাতে। পরিবারে প্রায় জনা পঁচিশেক সদস্য, সবাই গেছিলো যাত্রা দেখতে। ফিরতে ফিরতে রাত ১০টা বাজে। বাড়িতে ছিল একটি চাকর। সে তার আনুগত্যের পরিচয় রাখে লাঠি-বল্লমসহ আগত দুর্বৃত্তদের জন্যে দরজা খুলে দিয়ে। তারা লুকিয়ে থাকে ছাদে। পরিবারের সবাই ফিরে আসার পরে যখন দরজায় আগল পরে গেছে , তখন তারা নিচে নেমে আসে। মায়ের দিদা, ইতিমধ্যে, বাড়ির যে সবচেয়ে ছোট ছেলে তাকে নিয়ে এক নিরাপদ স্থানে লুকিয়ে। দুবৃত্তদের প্রধান উদেশ্য ছিল ওই পরিবারটির বংশনাশ করা, তারা বাড়ির মেয়েদের গায়ে কোনো হাত তোলেনি। কয়েক ঘন্টা পরে যখন বাড়ির সব পুরুষমানুষ ই মৃত, দুষ্কৃতীরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। সবার অজ্ঞাতসারে দিদা তখন সেই ছেলেটিকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সব অনিষ্টের গোড়া সেই চাকরের নজরে তারা পরে যায়। বেশিদূর যাওয়ার আগেই গুন্ডাদের দল হামলা করে। দিদার চোখের সামনে সেই বংশের শেষ বাতি টি নিভে যায়।
সেই রাতেই পায়ে হেটে যিনি নিজের বাপের বাড়ি ফিরে আসেন। সেখানে এসে দ্যাখেন আরেক কান্ড। বাড়ির সবাই তৈরী হচ্ছে গঙ্গা পার হয়ে ওপার বাংলায় যাওয়ার জন্যে; যে কোনো মুহূর্তে মুসলমানদের আক্রমণ হতে পারে। দিদার হাতে দেয়া হলো তার মায়ের গয়নার বাক্স আর কূমিল্লার বাড়ির দলিল। সেই নিয়ে রাতের অন্ধকারে বাড়িসুদ্ধ লোক পাড়ি দিলো নৌকায় চড়ে। মাঝনদীতে হঠাৎ হামলার সম্ভাবনা; দিদা সেই বাকশসুদ্ধ সব কাগজ ফেলে দিলো গঙ্গায় যাতে বোঝা না যায় যে তারা পালিয়ে যাচ্ছেন। অবশেষে বর্তমান পশ্চিম বাংলায় পদার্পন। তার ই কয়েক মাসের মধ্যে বাংলা হলো দ্বিখণ্ডিত।
এখানে এসে মায়ের দাদুর সাথে আলাপ হয়। তিনি তখন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, প্রগতিশীল যুবক, বিধবা কে বিয়ে করে ঘরে আনলেন সমাজের রাঙাচক্ষু উপেক্ষা করে.।
বহরমপুরে এক দুপুরবেলা মায়ের চুল আচড়াতে আচড়াতে তার দিদাভাই এই উপাখ্যান শুনিয়েছিলেন।
(পুনশ্চ: দীর্ঘদিনের চর্চার অভাবে বাংলা লেখার হাত নষ্ট হয়ে গেছে। তার মধ্যে অভ্র তে লেখার অভ্যেস নেই। লেখাটা আরো অনেক ভালো হতে পারতো।)

Comments

Popular posts from this blog

Scattering Stars Over Parking Lots

COFFEE

Songs With Our Eyes Closed